জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আল্পস পর্বতমালার হিমবাহগুলো দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। বরফের এই বিশাল ভাণ্ডার কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি পরিবেশের ভারসাম্য, জলপ্রবাহ এবং সংশ্লিষ্ট জনপদের ঝুঁকিও বাড়ছে।
হিমবাহের বরফ গলন ধীর করতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সিনথেটিক জিওটেক্সটাইল বা কৃত্রিম আবরণ (প্লাস্টিক নির্মিত ত্রিপল) ব্যবহার করা হচ্ছে। এবার সেই ব্যবস্থার তুলনায় কম ক্ষতিকর বিকল্প খুঁজতে সুইজারল্যান্ডে পরীক্ষা করা হচ্ছে একটি পরিচিত প্রাকৃতিক উপাদান—ভেড়ার লোম।
লোজান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ও গবেষক মনে করছেন, স্থানীয়ভাবে অব্যবহৃত ভেড়ার লোমকে কাজে লাগিয়ে হিমবাহ সুরক্ষায় একটি পরিবেশবান্ধব বিকল্প তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
প্লাস্টিকের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা
গ্রীষ্মকালে সূর্যের বিকিরণ ও তাপের প্রভাবে হিমবাহের বরফ দ্রুত গলতে থাকে। এই প্রক্রিয়া ধীর করতে বরফের ওপর সাদা রঙের সিনথেটিক জিওটেক্সটাইল বা বিশেষ আবরণ বিছিয়ে দেওয়া হয়। এসব আবরণ সূর্যের বিকিরণের একটি অংশ প্রতিফলিত করে এবং বরফের ওপর তাপের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
তবে এই ব্যবস্থার পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে সিনথেটিক উপাদান থেকে তন্তু বা মাইক্রোফাইবার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় হিমবাহ সংরক্ষণে কম ক্ষতিকর বিকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কাজ করছেন গবেষকেরা।
এই প্রেক্ষাপটে ভেড়ার লোমের প্রাকৃতিক তাপ-নিরোধক বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয় পরীক্ষা। লক্ষ্য ছিল এমন একটি জৈব অবক্ষয়যোগ্য উপাদান খুঁজে বের করা, যা একদিকে বরফ গলন ধীর করতে পারে, অন্যদিকে সিনথেটিক আবরণের পরিবেশগত প্রভাবও কমাতে পারে।
অব্যবহৃত উলকে সম্পদে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ
সুইজারল্যান্ডে প্রতিবছর উৎপাদিত ভেড়ার লোমের একটি বড় অংশ ব্যবহার করা হয় না। বিভিন্ন হিসাবে, মোট উলের প্রায় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ অব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত থেকে যায়; এর কিছু ফেলে দেওয়া হয়, আবার কিছু পুড়িয়েও ফেলা হয়।
এই অব্যবহৃত উলকে নতুন কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা থেকেই শুরু হয় ‘কিপ ইট উল’ (Keep It Wool) প্রকল্প। এর উদ্দেশ্য শুধু হিমবাহ সুরক্ষা নয়; একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে অব্যবহৃত একটি সম্পদকে পরিবেশগত কাজে লাগানো।
প্রকল্পটি লোজান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সুইস পরিবেশ সংস্থা সামিট ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে। এর সঙ্গে উলশিল্প, আবরণ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফিসোলান (Fisolan) এবং হিমবাহ পর্যবেক্ষণ গবেষকদেরও সহযোগিতা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ধারণা থেকে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে লোজান বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন মাস্টার্স শিক্ষার্থীর গবেষণাভিত্তিক ধারণা। পরিকল্পনাটি বাস্তবে পরীক্ষা করতে পশ্চিম সুইজারল্যান্ডের তসানফ্লেরোঁ (Tsanfleuron) হিমবাহের একটি অংশে উলের তৈরি আবরণ বসানো হয়।
চলতি বছরের ২২ জুন প্রায় ২০০ বর্গমিটার এলাকায় দুটি পরীক্ষামূলক উলের আবরণ বিছিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি আবরণের আকার ছিল ১০ মিটার × ১০ মিটার এবং সেগুলো ছিল ভিন্ন পুরুত্বের। তুলনার জন্য পাশে একই আকারের একটি সিনথেটিক জিওটেক্সটাইল আবরণও বসানো হয়।
পুরো গ্রীষ্মজুড়ে কঠিন আবহাওয়ার মধ্যে উলের আবরণ কতটা কার্যকর থাকে, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। দুই সপ্তাহ পরপর নেওয়া পরিমাপের মাধ্যমে আবরণের নিচে বরফ ও তুষার গলার মাত্রা এবং আবরণের স্থায়িত্ব মূল্যায়ন করা হয়েছে।
শুরুতে ফলাফল নিয়ে গবেষকেরা নিশ্চিত ছিলেন না। পরে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, উলের আবরণ প্রত্যাশার তুলনায় ভালোভাবে কাজ করছে।
এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থী এলিয়ট গাফিও পরীক্ষার প্রাথমিক ফল নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, দলটি শুরুতে কী ফল পাওয়া যাবে, তা নিয়ে নিশ্চিত ছিল না। পরে এমন একটি ফল পাওয়া গেছে, যা সরাসরি দেখা ও স্পর্শ করা যাচ্ছে। গাফির মতে, উলের আবরণ ‘অবিশ্বাস্যভাবে ভালো কাজ করেছে’।

প্রাথমিক ফল আশাব্যঞ্জক
এই ধারণাটিকে বাস্তবে প্রয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করতে সুইস প্রতিষ্ঠান ফিসোলানের সঙ্গে কাজ শুরু করেছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। যদিও শুরুতে হিমবাহের কঠিন পরিবেশে উলের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় ছিল।
তবে মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক তথ্য সেই সংশয় অনেকটাই কমিয়েছে।
দুই সপ্তাহ পরপর নেওয়া পরিমাপে দেখা গেছে, উলের আবরণ বরফ গলন ধীর করতে সিনথেটিক জিওটেক্সটাইলের সঙ্গে তুলনীয় ফল দিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও আবরণগুলো প্রত্যাশার তুলনায় ভালোভাবে স্থায়িত্ব দেখিয়েছে।
তবে এই ফলাফলকে চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংগৃহীত তথ্যের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ এখনও বাকি। উলের আবরণ দীর্ঘ সময় ধরে কতটা কার্যকর থাকে এবং বড় পরিসরে এর ব্যবহার কতটা বাস্তবসম্মত, সেটিও আরও গবেষণা ও পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।
চূড়ান্ত সমাধান নয়
ভেড়ার লোমের আবরণ নিয়ে প্রাথমিক ফল আশাব্যঞ্জক হলেও এটিকে হিমবাহ রক্ষার স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখছেন না প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
কারণ এই ধরনের আবরণ স্থানীয়ভাবে বরফ গলনের গতি কমাতে পারে, কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মূল কারণ দূর করতে পারে না। অর্থাৎ এটি একটি সীমিত ও স্থানীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা; জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বিকল্প নয়।
সুইজারল্যান্ডের হিমবাহের প্রায় ০.০২ শতাংশ এলাকায় বর্তমানে এ ধরনের জিওটেক্সটাইল সুরক্ষা আবরণ ব্যবহার করা হয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এসব আবরণ প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ ঘনমিটার তুষার সংরক্ষণে সহায়তা করে। তবে একই সময়ে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলো প্রায় ১০০ কোটি ঘনমিটার বরফ হারাচ্ছে। ফলে এ ধরনের স্থানীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক প্রভাব সীমিত।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক তিমোথে স্টেইনারের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের মূল সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ রক্ষা করতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর মতো কার্যকর প্রশমন বা ‘মিটিগেশন’ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
বর্জ্য থেকে পরিবেশ রক্ষার উপকরণ
ভেড়ার লোম দিয়ে হিমবাহ সুরক্ষার এই পরীক্ষা তাই শুধু একটি নতুন উপাদানের কার্যকারিতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব উপকরণ এবং বৃত্তাকার অর্থনীতির ধারণাও।
যে উল অনেক সময় অব্যবহৃত পড়ে থাকে বা বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, সেটি যদি হিমবাহ সুরক্ষায় ব্যবহার করা যায়, তাহলে একই সঙ্গে দুটি পরিবেশগত সমস্যার মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি একটি স্থানীয় ও তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য উপাদানকে নতুনভাবে ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। হিমবাহ সুরক্ষায় এমন বিকল্প কতটা কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদে তা পরিবেশগতভাবে কতটা টেকসই, তার উত্তর মিলবে আরও গবেষণা ও পরীক্ষায়।
ভেড়ার লোমের এই পরীক্ষা তাই আপাতত একটি সম্ভাবনার গল্প—যেখানে স্থানীয় সম্পদ, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন একসঙ্গে এসে গলতে থাকা হিমবাহকে কিছুটা সময় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে হিমবাহ সংকট মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান যে জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ মোকাবিলার মধ্যেই নিহিত, সেই বাস্তবতাও এতে স্পষ্ট।
তথ্যসূত্র: সামিট ফাউন্ডেশন ও রয়টার্স