.jpg)
বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাস নদী ও মাটির ইতিহাস থেকে আলাদা নয়। নদী পলি বহন করে, বন্যা সেই পলি ছড়িয়ে দেয়, নতুন চর ও কৃষিজমি তৈরি হয়; আর সেই মাটির ওপর দাঁড়িয়েই কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন। কিন্তু আধুনিক কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদে আমরা ধীরে ধীরে এই স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থানগত সম্পর্ক থেকে দূরে সরে গিয়ে এমন এক কৃষি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, যেখানে বাহ্যিক কৃষি-উপকরণ, রাসায়নিক সার, সেচ, বালাইনাশক ও অন্যান্য ইনপুট, উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থার অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই; বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনের বর্তমান সক্ষমতা তৈরিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আজকের প্রশ্ন আর শুধু ‘কীভাবে আরও বেশি উৎপাদন করা যায়’ নয়; বরং কীভাবে এমন কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, যা একই সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করবে, নদী ও জলব্যবস্থার Ecological Integrity রক্ষা করবে, জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করবে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও ঝুঁকি কমাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জমির উৎপাদনক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখবে।
এই পরিবর্তনের অর্থ রাসায়নিক সারকে রাতারাতি নিষিদ্ধ করা বা কৃষককে উৎপাদনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া নয়। বরং প্রয়োজন রাসায়নিক-নির্ভরতা থেকে একটি ধীরে ধীরে, জ্ঞানভিত্তিক ও স্থানভিত্তিক রূপান্তর, যেখানে মাটির নিজস্ব উর্বরতা, জৈব পদার্থ, ফসলের অবশিষ্টাংশ, স্থানীয় জৈব সম্পদ, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কৃষি ব্যবস্থার কেন্দ্রে ফিরে আসবে। আধুনিক ভাষায় এই পথকে আমরা পুনরুৎপাদনশীল কৃষি বা বৃহত্তর অর্থে Agro-Ecology–এর দিকে যাত্রা বলতে পারি। এখানে লক্ষ্য কেবল Input কমানো নয়; লক্ষ্য হলো আমাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃতির প্রক্রিয়াকে ক্রমান্বয়ে পুনরুদ্ধার করে কৃষির উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত করা এবং যে মাটি ও জলব্যবস্থা আমাদের খাদ্য দেয়, তাদের পুনরুজ্জীবিত করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইউরিয়ার মূল্যবৃদ্ধি কিংবা কৃষি-উপকরণের ক্রমবর্ধমান ব্যয়কে শুধু একটি অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। বরং এটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে, বাংলাদেশের কৃষি কি আরও বেশি বাহ্যিক Input-এর ওপর নির্ভরশীল হবে, নাকি ধীরে ধীরে এমন এক পুনরুৎপাদনশীল কৃষি ও Agro-Ecological কৃষির দিকে এগোবে—যেখানে নদীর পলি, মাটির জৈব পদার্থ, প্রাকৃতিকভাবে নাইট্রোজেন ও অন্যান্য মিনারেলের প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, জীববৈচিত্র্য, পানি এবং কৃষকের জ্ঞান, সবকিছুকে উৎপাদনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই হারানো সংযোগের দিকে, নদী থেকে মাটি, মাটি থেকে ফসল, আর ফসল থেকে কৃষকের গোলা।
ইউরিয়া কৃষির শত্রু নয়; কিন্তু নির্ভরশীলতাই প্রশ্নের বিষয়
বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনের বর্তমান সাফল্যকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে ধান উৎপাদনে উচ্চফলনশীল জাত, সেচ, রাসায়নিক সার, কৃষিযন্ত্র এবং কৃষি গবেষণার সম্মিলিত অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। বোরো ধান আজ দেশের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কৃষকের কাছে ইউরিয়া তাই কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। তারা জানেন, সময়মতো Nitrogen না পেলে ধানের গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, কুশি কমতে পারে, ফলন কমে যেতে পারে। ফলে শুধু ‘ইউরিয়ার ব্যবহার কমান’—এমন পরামর্শ কৃষকের কাছে বাস্তবসম্মত নয়। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করতেই পারেন, ‘কম দিলে যদি ফলন কমে, সেই ক্ষতি কে বহন করবে?’—এ প্রশ্নের উত্তর কৃষককে না দিয়ে শুধু সার ব্যবহারের পরিমাণ কমানোর আহ্বান করা অন্যায়। সুতরাং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ইউরিয়া কমানো নয়, ইউরিয়ার অপচয় কমানো। ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী Nitrogen প্রয়োগ, সঠিক সময়ে প্রয়োগ, একবারে না দিয়ে কয়েক কিস্তিতে প্রয়োগ, এবং Leaf Colour Chart (LCC) বা Soil Plant Analysis Development (SPAD)-এর মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রয়োজন নির্ধারণ, এসবের মাধ্যমে একই সঙ্গে উৎপাদন ও Input Efficiency উন্নত করা সম্ভব। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণাতেও এমন ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা দেখা গেছে। অর্থাৎ কৃষকের সামনে বাস্তব বিকল্প আছে। দরকার সেই বিকল্পকে মাঠে সহজ, বিশ্বাসযোগ্য এবং ব্যবহারযোগ্য করে তোলা।
‘বেশি সার’ আর ‘বেশি ফলন’—এক কথা নয়
আমাদের কৃষি সংস্কৃতিতে একটি ধারণা দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী হয়েছে—বেশি সার দিলে বেশি ফলন। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একটি ফসলের পুষ্টি চাহিদা নির্ভর করে মাটির ধরন, আগের ফসল, জাত, ফলনের লক্ষ্য, আবহাওয়া, সেচ এবং ব্যবস্থাপনার ওপর। একটি জমিতে যে পরিমাণ নাইট্রোজেন প্রয়োজন, অন্য জমিতে তা একই নাও হতে পারে। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন কৃষকের অর্থের অপচয় ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা, পুষ্টির অপচয় এবং পরিবেশগত সমস্যাও তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ইউরিয়া বা নাইট্রোজেন—এর ঘাটতিও ফলন কমিয়ে দিতে পারে। সুতরাং কৃষির বুদ্ধিমান পথটি মাঝখানে, ‘যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই।’ এখানে মাটি পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সার ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০২৪ মাটি পরীক্ষা ও ফসলভিত্তিক পুষ্টি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু শুধু নির্দেশিকা থাকলেই হবে না। সেই জ্ঞানকে কৃষকের জমিতে পৌঁছাতে হবে।
মাটির যে ক্ষত চোখে দেখা যায় না
বাংলাদেশের মাটির নীরব সমস্যা হলো জৈব পদার্থের ঘাটতি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এর সার ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০২৪ অনুযায়ী একটি ভালো মাটিতে অন্তত ২.৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ মাটিতে এর পরিমাণ ১.৫ শতাংশের নিচে এবং কিছু মাটিতে ১ শতাংশেরও কম। তবে বাংলাদেশের সব মাটির অবস্থা এক নয়, অঞ্চল ও Cropping system অনুযায়ী পার্থক্য রয়েছে। এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে যে মাটির ২.৫% জৈব পদার্থ মানে বাকি ৯৭.৫% ‘জৈব পদার্থবিহীন মৃত অংশ’ নয়। বরং মাটি একটি জটিল খনিজ + জৈব + পানি + বায়ু + জীবন্ত প্রাণের বাস্তুতন্ত্র। রাসায়নিক সার ব্যবহার হয়েছে বলেই মাটি নষ্ট হয়েছে, এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
মাটির অবক্ষয়ের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে, অতিরিক্ত ও অসমতাপূর্ণ সার প্রয়োগ, ফসলের অবশিষ্টাংশ (Crop Residue) জমিতে ফিরিয়ে না দেওয়া, মাটি থেকে ফসলের মাধ্যমে পুষ্টি উপাদান বেরিয়ে যাওয়ার পর তা পর্যাপ্তভাবে পুনরায় পূরণ না করা (Nutrient Mining), দীর্ঘদিন একই ধরনের ফসল বিন্যাস বা শস্যক্রম (Cropping pattern) অনুসরণ, মাটিক্ষয় (Soil Erosion), লবণাক্ততা বা অম্লতা (Salinity/ Acidity), অতিরিক্ত চাষ এবং স্থানীয় কৃষি-পরিবেশগত (Agro-Ecological) চাপ। বিশেষ করে Nutrient Mining/ পুষ্টি উপাদান নিঃশেষণ-এর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একটি জমি থেকে প্রতিবছর ফসলের সঙ্গে যদি নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান বেরিয়ে যায়, কিন্তু ফসলের অবশিষ্টাংশ, জৈব পদার্থ, পলি বা অন্যান্য উৎসের মাধ্যমে সেই পুষ্টির পর্যাপ্ত অংশ মাটিতে ফিরে না আসে, তাহলে মাটির স্বাভাবিক পুষ্টিভাণ্ডার ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। বাইরে থেকে কিছু রাসায়নিক সার প্রয়োগ করলেও সবসময় এই ঘাটতি পূরণ হয় না, কারণ মাটির উর্বরতা শুধু কয়েকটি প্রধান পুষ্টি উপাদানের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জৈব পদার্থ, অণুপুষ্টি, মাটির গঠন, পানি ধারণক্ষমতা এবং মাটির জীবন্ত অণুজীবও গভীরভাবে যুক্ত। মাটির জৈব উপাদান শুধু পুষ্টির একটি উৎস নয়। এটি মাটির গঠন, পানি ধারণক্ষমতা, পুষ্টির আবর্তন এবং মাটির জৈবিক কার্যকলাপ—এর সঙ্গে যুক্ত। সে কারণেই কৃষিবিজ্ঞানীরা মাটির জৈব উপাদানকে অনেক সময় মাটির প্রাণের সঙ্গে তুলনা করেন।
জৈব সার, বিকল্প নয়, সহযাত্রী
এখানে জৈব সার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন।জৈব সারকে ইউরিয়ার সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। অধিকাংশ জৈব সারে নাইট্রোজেনের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে কম এবং এর পুষ্টি ধীরে ধীরে উদ্ভিদের জন্য Available হয়। ফলে উচ্চফলনশীল ধান উৎপাদনে প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেনের সম্পূর্ণ চাহিদা শুধু জৈব সার দিয়ে পূরণ করা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবসম্মত বা অর্থনৈতিকভাবে বিবেচনায় নেওয়ার মতো নয়। করণীয় হচ্ছে Integrated Nutrient Management বা সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে খনিজ সারের প্রয়োজনীয় পরিমাণ ব্যবহার করা, একই সঙ্গে কম্পোস্ট, খামারের বর্জ্য সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ, সবুজ সার এবং অন্যান্য নিরাপদ Organic Amendment/জৈব সংশোধনী-এর মাধ্যমে মাটির জৈব পদার্থ ও জৈবিক স্বাস্থ্য উন্নত করা। এখানে লক্ষ্য রাসায়নিক সার বাদ দেওয়া নয়। লক্ষ্য হলো কৃষিকে অকারণ ইনপুট নির্ভরতা থেকে দক্ষ পুষ্টি ব্যবস্থাপনার দিকে নিয়ে যাওয়া।
নদীর সঙ্গে এই আলোচনার সম্পর্ক
এটির উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নদীর তীরে যেতে হবে। বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ Flood plain, চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী কৃষি আমাদের জাতীয় খাদ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে নদীর চরগুলোতে কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি ভূমিহীন বা ভূমি-অনিশ্চিত মানুষের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। চর একটি স্থির ভূখণ্ড নয়। নদী তার আকৃতি বদলায়। কোথাও পলি জমে নতুন ভূমি তৈরি হয়, কোথাও স্রোত জমি কেটে নিয়ে যায়। ফলে চর কৃষকের কাছে একই সঙ্গে ঝুঁকি এবং সম্ভাবনা। নতুন চর মানে নতুন কৃষির সম্ভাবনা। কিন্তু সেই কৃষি মূল ভূখণ্ডের কৃষির অনুকরণে পরিচালনা করলে চলবে না। চরের বালুময়তা, আর্দ্রতা, বন্যার স্থায়িত্ব, পলি জমার ধরন, নদীর গতিপথ এবং ফসল কাটার সময়, সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে। কোথাও স্বল্পমেয়াদি ফসল, কোথাও গম/ভুট্রা বা দানাদার শস্য, কোথাও সব্জি, কোথাও কৃষি বনায়ন—এমন স্থানিক চাষ ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। চরকে তাই শুধু ‘নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা’ হিসেবে দেখলে তার কৃষি সম্ভাবনার বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে।
নদীর পলি শুধু Sediment/তলানি পরা পলল নয়, নদী-নির্ভর জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে-এর একটি মৌলিক জায়গা আছে। নদীকে যদি শুধু পানি বহনের Channel হিসেবে দেখা হয়, তাহলে নদী ও কৃষির সম্পর্ক বোঝা সম্ভব নয়। একটি নদী পলি বহন করে, বন্যা সেই পলি প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, Flood pulse/ বন্যা-স্পন্দন এবং Sediment Dynamics/পলি গতিশিলতা বাংলাদেশের বহু কৃষি-ভূদৃশ্যের বিবর্তনের অংশ। অবশ্য আধুনিক বাঁধ, বাঁধ, নদীশাসন, উজানের দিকে হস্তক্ষেপ, ভাঙন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই স্বাভাবিক Ecological Process/ বাস্তুসংস্থানিক প্রক্রিয়া অনেক জায়গায় বদলে গেছে। ফলে নদীর স্বাস্থ্য এবং কৃষির স্বাস্থ্যকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। যে নদী অসুস্থ, তার তীরের কৃষিও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ থাকতে পারে না। এ কারণেই নদী রক্ষার আলোচনা শুধু নৌচলাচল, জলপ্রবাহ বা নদীভাঙন—এর আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ জীবিকার সম্পর্কও বিবেচনায় আনতে হবে।
নদীর কচুরিপানা, সমস্যার ভেতর সম্পদের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের জলাভূমি ও নদী-খালে কচুরিপানা একটি পরিচিত দৃশ্য। অনেক জায়গায় এটি জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে, নৌযান চলাচলে সমস্যা তৈরি করে এবং জলজ ইকোসিস্টেমে চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু একই বায়োমাসকে নিরাপদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কম্পোস্ট বা মাটি সংশোধনকারী উপাদানে রূপান্তর করা সম্ভব। তবে এখানে অতিরিক্ত উৎসাহও বিপজ্জনক। দূষিত নদী, শিল্পাঞ্চল, ভারী ধাতু দ্বারা দূষিত জলাশয় থেকে সংগ্রহ করা কচুরিপানা পরীক্ষা ছাড়া কৃষিজমিতে ব্যবহার করা উচিত নয়। নিরাপদ মডেল হওয়া উচিত, সংগ্রহ- বাছাই- কম্পোষ্ট করা- প্রয়োজনীয় মান পরীক্ষা- কৃষিজমিতে প্রয়োগ। এই ধারণাটি নদী ও কৃষির মধ্যে একটি নতুন বৃত্তাকার সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। একইভাবে শহরের বাজার, রান্নাঘর ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে উৎপন্ন উৎসস্থলে পৃথকীকৃত জৈব বর্জ্য কম্পোস্ট হয়ে কৃষিজমিতে ফিরতে পারে।তবে ‘শহরের আবর্জনা’ আর ‘নিরাপদ জৈব বর্জ্য’—এই দুটি এক জিনিস নয়। মিশ্র পৌর বর্জ্য, প্লাস্টিক, গ্লাস, ব্যাটারি, শিল্প বর্জ্য বা ধূষিত কাদা Sludge) কৃষিজমিতে ফিরিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই স্থায়িত্বশীল কৃষির অংশ হতে পারে না।
বোরো ধান, শুধু সার নয়, পানিরও প্রশ্ন
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বোরো ধানের অবদান বিশাল। কিন্তু এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত মূল্য-ও রয়েছে, তা হচ্ছে সেচ। শুষ্ক মৌসুমের বোরো উৎপাদন দেশের বহু অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে সারের কার্যকারিতা এবং জল-ব্যবহারের কার্যকারিতাকে একই আলোচনায় আনতে হবে। কৃষকের খরচ কমাতে শুধু ইউরিয়া কমানোর কথা বললে হবে না। একই সঙ্গে দেখতে হবে, কত পানি লাগছে, কতবার সেচ দিতে হচ্ছে, সেচের জন্য কত ডিজেল বা বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, কত নাইট্রোজেন ফসল গ্রহণ করছে, মাটির কতটা পুষ্টির অপচয় হচ্ছে? পর্যায়ক্রমিক ভেজানো ও শুকানো/Alternate Wetting and Drying (AWD)-এর মতো পানি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি এবং সুনির্দিষ্ট পুষ্টি ব্যবস্থাপনা খামার কৌশলের অংশ হওয়া উচিত। কৃষকের প্রকৃত লাভ হলো, এক মৌসুমে মোট খরচ কমিয়ে লাভজনক উৎপাদন ধরে রাখা। এক বস্তা ইউরিয়া কম কেনাই তার একমাত্র মাপকাঠি নয়।
কৃষকের পরামর্শদাতা কে?
এখানে আমাদের কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে। কৃষক যখন সিদ্ধান্ত নেন, কত ইউরিয়া দেবেন, কখন দেবেন, কোন বালাইনাশক ব্যবহার করবেন, কোন জাত লাগাবেন, তখন তার কাছে কি তার জমির মাটি পরীক্ষার ফলাফল থাকে? অনেক সময়ই থাকে না। তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশী কৃষক, স্থানীয় নেতা অথবা নিজের আগের বছরের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেন। এখানে কৃষককে দোষারোপ করা সহজ, কিন্তু তা সমাধান নয়। কৃষককে যদি সহজ, নির্ভরযোগ্য এবং সময়োপযোগী কারিগরি পরামর্শ না দেওয়া হয়, তাহলে তিনি কিভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন? LCC প্রযুক্তি মাঠে পৌঁছাতে হলে শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে হবে না। কৃষকের হাতে প্রযুক্তি দিতে হবে, প্রদর্শন করতে হবে, সম্প্রসারণ-পরবর্তী কার্যক্রম করতে হবে এবং কৃষকের নিজের জমিতে ফল দেখাতে হবে। একজন কৃষককে বোঝানোর সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি এখনও অন্য কৃষকের জমিতে ফলন দেখানো।
বাংলাদেশের কৃষিকে এখন একটি নতুন সমীকরণে ভাবার সময় এসেছে
মাটি + পানি + নদী + কৃষক + জীববৈচিত্র্য = টেকসই খাদ্যব্যবস্থা—এই সমীকরণে সার থাকবে, কিন্তু সারই কেন্দ্র হবে না। সেচ থাকবে, কিন্তু সীমাহীন ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন থাকবে না। জৈব সার থাকবে, কিন্তু ‘সবকিছুর বিকল্প’ হিসেবে নয়। উচ্চফলনশীল জাত থাকবে, কিন্তু বাস্তুসংস্থানগত উপযোগিতা উপেক্ষা করে নয়। বালাইনাশক থাকবে, কিন্তু সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার বাইরে নয়। আর কৃষক থাকবেন সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে, কেবল ভর্তুকির সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, বরং জ্ঞান ও উদ্ভাবনের অংশীদার হিসেবে। এই পরিবর্তনের জন্য কোনো অলৌকিক প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই। আমাদের হাতে ইতিমধ্যেই অনেক উপকরণ রয়েছে। প্রথমত, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সারের সুপারিশকে বাস্তব মাঠ ব্যবস্থাপনার অংশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধানসহ প্রধান ফসলে নাইট্রোজেন-ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে পাতার রঙের তালিকা (LCC) এবং মৃত্তিকা ও উদ্ভিদ বিশ্লেষণ উন্নয়ন। (SPAD), স্প্লিট অ্যাপ্লিকেশন এবং উপযুক্ত বসিয়ে-এর ব্যবহার বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, কৃষিজমিতে জৈব পদার্থ ফিরিয়ে আনার জাতীয় কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে, ফসলের অবশিষ্টাংশ, কম্পোস্ট, সার ও নিরাপদ স্থানীয় বায়োমাসের ওপর ভিত্তি করে। চতুর্থত, শহরের উৎসস্থলে পৃথকীকৃত জৈব বর্জ্য এবং গ্রামের কৃষিজ বায়োমাসকে একটি বৃত্তাকার পুষ্টি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। পঞ্চমত, বোরো অঞ্চলে সার ব্যবহারের দক্ষতার পাশাপাশি পানি ব্যবহারের দক্ষতাকে কৃষি নীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক করতে হবে। ষষ্ঠত, চর ও নদীতীরবর্তী অঞ্চলের জন্য আলাদা নদী-তীরবর্তী কৃষি কৌশল প্রয়োজন, যেখানে বন্যা, ক্ষয়, পলি, মাটির আর্দ্রতা এবং শস্য বহুমুখীকরণ একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে। সপ্তমত, নদী পুনরুদ্ধার ও অববাহিকা ব্যবস্থাপনার আলোচনায় কৃষিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারণ নদী ও কৃষি দুটি আলাদা ভূগোল নয়; একই প্রাকৃতিক ভূচিত্র-এর দুটি পরস্পরনির্ভর অংশ।
কৃষিতে হারানো সংযোগটি ফিরিয়ে আনা
বাংলাদেশের কৃষি আমাদের অনেক দিয়েছে। উৎপাদন বেড়েছে, খাদ্যঘাটতি কমেছে, কৃষির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বেড়েছে। এই অর্জনকে অস্বীকার করে সামনে যাওয়া যাবে না। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ের কৃষির প্রশ্নটি ভিন্ন। এখন শুধু জানতে হবে না, এক বিঘায় কত মণ ধান হলো। জানতে হবে, কত খরচে হলো, কত পানি লাগল, কত সার নষ্ট হলো, মাটির জৈব পদার্থ বাড়ল না কমল, কৃষক কত লাভ করলেন, নদীর ওপর চাপ কতটা পড়ল, আর একই জমি কি আগামী দশকেও একইভাবে উৎপাদন করতে পারবে? এই প্রশ্নগুলোই আমাদের কৃষি-চিন্তার পরবর্তী অধ্যায় নির্ধারণ করবে। রিভারাইন পিপলের-এর মতো নদীকেন্দ্রিক নাগরিক উদ্যোগের জন্য এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। নদী রক্ষার কাজকে যদি খাদ্য, কৃষি, মাটি ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে নদী আন্দোলন আরও গভীর সামাজিক অর্থ পেতে পারে। নদী রক্ষা মানে শুধু নদীর পানি রক্ষা নয়, মাটি রক্ষা মানে শুধু জমির উর্বরতা রক্ষা নয়, কৃষক রক্ষা মানে শুধু কৃষি ভর্তুকি নয়। তিনটিকে একসঙ্গে দেখতে হবে। কারণ নদী পলি দেয়, মাটি ফসল দেয়, কৃষক খাদ্য ফলায়, আর সেই খাদ্যই একটি দেশের সামাজিক স্থিতি ও মানুষের জীবনকে টিকিয়ে রাখে। তাই বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ যেন আরও বেশি সার ব্যবহারের মধ্যে না হয়; বরং নদী, মাটি, পানি ও কৃষকের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সেই পুরোনো সংযোগটিকে আধুনিক বিজ্ঞান, প্রকৃতি ভিত্তিক সমাধান ও নতুন কৃষি-দর্শনের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার মধ্যেই। নদীর পলি থেকে কৃষকের গোলা, এই পথটি শুধু আমাদের অতীতের গল্প নয়। এটিই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই কৃষির ভবিষ্যৎ পথ।