পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন পরিবেশবান্ধব দেশ। ১৭৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম। বিশ্বের দেশে দেশে পরিবেশ সুরক্ষায় নেওয়া উদ্যোগ ও এর কার্যকারিতার ভিত্তিতে এই তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার এক চরম 'ওয়েক-আপ কল'।
সম্প্রতি ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই)’ শিরোনামে এই সূচকটি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পরিবেশ সুরক্ষা এজেন্সি (ইপিআই)। দেশটির এমসিকল ম্যাকবেইন ফাউন্ডেশনের সহায়তায় কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সূচকটি তৈরি করেছেন।
এই পরিবেশ সুরক্ষা সূচকটি তৈরিতে পরিবেশগত স্বাস্থ্য, প্রতিবেশব্যবস্থার সচলতা ও জলবায়ু পরিবর্তন—এই তিনটি প্রধান ক্ষেত্র বিবেচনা করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলোর অধীন বায়ুর মান, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য ও আবাসস্থল সংরক্ষণ, জলজ প্রতিবেশ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর মতো ৪৭টি নির্দেশক ব্যবহার করা হয়েছে।
১৭৭ দেশের মধ্যে ১৭৫তম বাংলাদেশ
২০২৪ সালের সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৭৫তম (ষষ্ঠ সর্বনিম্ন) অবস্থানে থাকলেও, ২০২৬ সালে ১৭৭টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১৭৫তম।
সূচক অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৮ দশমিক ১, যা ২০২৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৩ দশমিক ৪৬-এ।অর্থাৎ, গত দুই বছরে জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আমরা উন্নতির বদলে আরও পিছিয়েছি।
দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে ভুটান, তলানিতে ভারত
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষার লড়াইয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এই অঞ্চলের আটটি দেশের মধ্যে ভারত ছাড়া বাকি সবাই বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
* ভুটান: ৫২তম (দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে, স্কোর ৪৭ দশমিক ৭৪)।
* শ্রীলঙ্কা: ৯৪তম।
* নেপাল ১২৮তম
* আফগানিস্তান ১৩৫
* মালদ্বীপ ১৭১তম
* পাকিস্তান: ১৫৭তম।
* বাংলাদেশ: ১৭৫তম (স্কোর ২৩.৪৬)।
* ভারত: ১৭৬তম (স্কোর ২২.৪৬)।
ভুটান বা শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর এই তুলনামূলক সাফল্যের মূল কারণ হলো তাদের টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নীতি। বিপরীতে, বাংলাদেশ ও ভারতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিবেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইউরোপের জয়জয়কার, পিছিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন
২০২৬ সালের সূচকে শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে ১৯টিই ইউরোপের। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য অভাবনীয়। এস্তোনিয়া (স্কোর ৭৪ দশমিক ৭৯) এই তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। এরপরই রয়েছে লুক্সেমবার্গ (স্কোর ৭৪ দশমিক ২৪) ও যুক্তরাজ্য (স্কোর ৭১ দশমিক ৫১)।
শীর্ষ দশে ঠাঁই পাওয়া অন্য দেশগুলো হলো ফিনল্যান্ড (চতুর্থ), নেদারল্যান্ডস (পঞ্চম), জার্মানি (ষষ্ঠ), ফ্রান্স (সপ্তম), নরওয়ে (অষ্টম), সুইডেন (নবম) ও অস্ট্রিয়া (১০ম)।
বিশ্বের বড় দুই অর্থনীতি ও কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এ তালিকায় ২৭তম (স্কোর ৫৮ দশমিক ৫৪) এবং চীন (১২৯তম) (স্কোর ৩৩ দশমিক ৮৮)।
এ সূচকে সবচেয়ে তলানিতে থাকা পাঁচটি দেশ হলো লাওস (১৭৭তম), ভারত (১৭৬তম), বাংলাদেশ (১৭৫তম), মালি (১৭৪তম) ও ভিয়েতনাম (১৭৩তম)।
এস্তোনিয়ার সাফল্যের কারণ সম্পর্কে গবেষকরা বলেছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা, দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনের পর্যায়ক্রমিক অবসান এস্তোনিয়াকে তালিকার শীর্ষে নিয়ে এসেছে।
বাস্তুতন্ত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে ‘সর্বনিম্ন’
বাংলাদেশের পরিবেশগত বিপর্যয়ের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিকটি হলো আমাদের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের করুণ দশা। এবারের সূচকে সবচেয়ে 'শকড' হওয়ার মতো তথ্যটি হলো—বাস্তুতন্ত্রের সচলতা (Ecosystem Vitality) ক্যাটাগরিতে ১৭৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭তম। অর্থাৎ, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সবার নিচে।
* বায়ুর মান: ১৭১তম অবস্থান। বিষাক্ত ধূলিকণা ও গ্যাসের কারণে সাধারণ মানুষের ফুসফুস এখন চরম ঝুঁকিতে।
* বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস: বনভূমি উজাড়, প্রাকৃতিক জলাশয় দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ আমাদের এই তলানিতে নিয়ে ঠেকেছে।
* বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আমাদের মাটি ও পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে।
এআই এবং স্যাটেলাইট ডেটা
এবারের সূচক তৈরিতে মোট ৪৭টি নির্দেশকের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে বন উজাড়, বায়ুদূষণ এবং কার্বন নিঃসরণের তথ্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত।